adimage

১৮ Jul ২০১৯
বিকাল ০১:১৭, বৃহস্পতিবার

পুলিশ প্রহরায় রাতভর নুরুল্লাপুরের তিন মঞ্চে পাল্লা দিয়ে চলল অশ্লীল নাচ !

আপডেট  08:11 PM, জানুয়ারী ৩০ ২০১৮   Posted in : জাতীয় আঞ্চলিক ভিডিও দোহার-নবাবগঞ্জের সংবাদ    

পুলিশপ্রহরায়রাতভরনুরুল্লাপুরেরতিনমঞ্চেপাল্লাদিয়েচললঅশ্লীলনাচ!

অমিতাভ অপু:
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত দুইটা। দোহার উপজেলার নুরুল্লাপুর মেলা প্রাঙ্গনের একেবারে শেষ অংশ ঘিরেই যেন সববয়সী মানুষের ঢল। একেবারে পাশাপাশি তিনটি প্যান্ডেল। একপাশে সার্কাস আরেকপাশে ভ্যারাইটিশো ও যাদু প্রদর্শনের পৃথক দুটি মঞ্চ। এই তিন মঞ্চকে উদ্দেশ্য করে যেন গভীর রাতে মানুষের বাধ ভাঙা জোয়ার। প্রতিটি মঞ্চের প্রবেশ মুখে মানুষের লম্বা লাইন। সবার হাতে হাতে ১০০ বা ২০০ টাকা মূল্যমানের টিকিট। এই তিন মঞ্চের চারপাশে দেখা গেল ৫/৬ জন পুলিশ সদস্যের অবস্থান। আলো সল্পতার কারনে নামগুলো বুঝা না গেলেও পোশাকের পেছনের অংশ পুলিশ লেখা দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না যে এরা বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্য। গোপন ভিডিও ক্যামেরা সঙ্গী করে এই প্রতিবেদক টিকিট কেটে একে একে তিনটি আয়োজনের মূল মঞ্চে প্রবেশ করলেন। প্রতিটি মঞ্চের মাইকে আয়োজকদের একই ঘোষণা ‘মোবাইলে কেউ ভিডিও বা ছবি তুললে তার মোবাইল নিয়ে নেয়া হবে’। এরপর একে একে চলতে থাকল স্বল্পবসনা তরুনীদের অশ্লীল নাচ। প্রতি শো’এর শেষ অংশে নাচতে নাচতে অনেকটা অর্ধনগ্ন হয়ে যান তরুনীরা আর তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সামনের সাড়িতে থাকা দর্শকরা। নাচের তালে তালে উড়তে থাকে টাকা। যত বেশি টাকা তত বেশি নগ্নতা। আবার বিশেষ ব্যবস্থাও লক্ষ্য করা যায় প্যান্ডেলের পেছনের অংশে। নাচতে আসা শিল্পীদের সাজঘরে (গ্রীনরুম) নিয়ে যাওয়া হয় বেশি আগ্রহী দর্শকদের। সেখানে আবার বেশি টাকার বিনিময়ে অসামাজিক কার্যকলাপের ষোলকলা পূর্ণ করা হয়। ঠিক একইভাবে চলছে ভ্যারাইটিশো’এর পৃথক দুটি মঞ্চ। ‘শো’ চলাকালীন ভেতরেও ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায় পুলিশকে। আর দর্শকদের তো কেউ কাউকে চেনার উপায় নেই। সবারই মুখ একেবারে বাধা। শুধু চোখ দুটো বের করা। বিষয়টি এমনই যে, বাবা-ছেলে পাশাপাশি বসে দেখলেও কেউ কাউকে চেনার উপায় নেই। মঞ্চের চারপাশ ঘিরে সবসময়ই থাকছে আয়োজকদের কড়া পাহাড়া। কেউ মোবাইলে ভিডিও বা ছবি তুলছেন কিনা এটাই তারা ঘুরে ঘুরে দেখছেন।  ভ্যারাইটিশো তে প্রতি শো-এর জন্য নির্ধারিত সময় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। টিকিটের মূল্য চেয়ার ২০০ টাকা আর বাংলার মাটি (দাঁড়িয়ে) ১০০ টাকা। অনেকটা একই অবস্থা সার্কাসের ক্ষেত্রেও। নামে সার্কাস হলেও আয়োজনের বেশি অংশে দেখানো হচ্ছে তরুনীদের অশ্লীল নাচ। ১ ঘন্টার প্রদর্শনীতে টিকিটের মূল্য চেয়ার ১৫০ টাকা আর বাংলার মাটি (দাঁড়িয়ে) ১০০ টাকা। মঙ্গলবার রাত ১ টা থেকে  ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে একই চিত্র লক্ষ করা যায়। একথায় পুলিশ প্রহরায় যেন পৃথক তিন মঞ্চে পাল্লা দিয়ে চলছে অশ্লীলতার মাত্রা। আর এ আয়োজনের পাশেই চলছে চার শ বছরের ঐতিহ্যবাহী নুরুল্লাহপুর ফকিরবাড়ির ওরস। চলছে ভক্ত-আশেকানদের জিকির-আসকার। অশ্লীল গানের শব্দে যেন ওরসের আয়োজন একেবারে ম্লান। রাতভর প্রকাশ্যেই চলছে ১০/১২টি জুয়ার কোট আর গাঁজার আসর।   
    
জানা যায়, দোহার উপজেলার চার শ বছরের ঐতিহ্যবাহী নুরুল্লাহপুর ফকিরবাড়ির ওরসকে কেন্দ্র করে বসা মেলায়ই এমন অশ্লীল নৃত্যের আয়োজন করা হয়েছে। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই নুরুল্লাহপুর মেলা প্রাঙ্গণে অশ্লীল নাচের জমজমাট আয়োজন করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হয়ে অন্তত সাতদিন সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত চলবে এ ভ্যারাইটি শো। মেলা এলাকার বেশির ভাগ কিশোর ও যুবক ছেলেরা এই আয়োজনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। কুরুচিপূর্ণ দৃশ্য দেখতে মেলা প্রাঙ্গণে ঢল নামছে উচ্ছৃঙ্খল মানুষের। ঘটছে নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা; কিন্তু সব জেনেও প্রশাসন কার্যত কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বিরাজ করছে এলাকাবাসীর মাঝে। সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টির এমন আয়োজনকে ঘিরে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মাঝে। বিভিন্ন ধরনের পোস্টের মাধ্যমে প্রকাশ্যে অশ্লীল আয়োজনের প্রতিবাদ জানাচ্ছে তারা।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, দোহার উপজেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক আকতার হোসেন ও তাঁর বাবা সিরজন মোল্লা এবং কুসুমহাটি ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মামুন খাঁ ভ্যারাইটি শো ও সার্কাস পরিচালনা করছেন। অন্তরালে আরো রয়েছে রাজনৈতিক নামধারী বেশ কিছু কর্তাব্যক্তি। এদিকে মেলাকে কেন্দ্র করে প্রাঙ্গণে গাঁজা বিকিকিনি বেশ জমে উঠেছে। চলছে কার্ডের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে অভিনব জুয়ার আসর।

স্থানীয়রা জানায়, গত বছর মেলায় এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে তা সংঘর্ষ, মামলা-হামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে। তার পরও প্রশাসন আগেভাগে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমরা স্থায়ীভাবে এ ধরনের কর্মকা- বন্ধের দাবি জানাই।

এ বিষয়ে ভ্যারাইটি শোর আয়োজক উপজেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক আকতার হোসেন বলেন, ‘আমি সার্কাসের সঙ্গে জড়িত। ভ্যারাইটি শো কারা করছে, তা আমার জানা নেই।’ তিনি একপর্যায়ে ওই আয়োজনের সঙ্গে মামুন খাঁর সম্পৃক্ততার কথা বলেন।

কুসুমহাটি ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মামুন খাঁ বলেন, ‘ভ্যারাইটি শো’র সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বা কারা এটা করছে আমার জানা নেই, থানা-পুলিশ ভালো বলতে পারবে।’

দোহার থানার পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মেলাকে কেন্দ্র করে কোন ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ মেনে নেওয়া হবে না। কেউ যদি অশ্লীল কোনো আয়োজন করার চেষ্টা করে, তাহলে অভিযান চালিয়ে সব ভেঙে দেওয়া হবে।’

দোহার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগের কোনো অঙ্গসংগঠন এ ধরনের অশ্লীল আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। যদি কেউ থেকে থাকে তাদের দায়ভার দল নেবে না। আমি র‌্যাব ও পুলিশকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছি। অশ্লীল কোনো আয়োজন করা হলে, তা শক্ত হাতে দমন করা হবে।’

উল্লেখ্য, নুরুল্লাহপুর দরবার শরিফের ওরসকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এমনকি বিদেশ থেকেও হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে মেলা প্রাঙ্গণে। মঙ্গলবার রাতে ধামাইলের মাধ্যমে ওরস হয়। অন্তত ১৫ দিন পর্যন্ত মেলা চলবে।



সর্বাধিক পঠিত

Comments

এই পেইজের আরও খবর

মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন

nazrul